লামায় উজার হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল, হোতা কাইয়ুম

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বনের গাছ কাটা, জোত বিক্রি ও পারমিট সরকারিভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও বন উজাড় করে কাঠ পাচার বন্ধ হচ্ছে না। একের পর এক সংরক্ষতিত  বনাঞ্চল বৃক্ষ শূন্য করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষার লক্ষ্যে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সংরক্ষিত ও প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে গাছ কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার প্রস্তাবে সম্প্রতি অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

আর সরকারি এই সিদ্ধান্তকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে শুধুমাত্র পার্বত্য জেলা বান্দরবানের লামার বনাঞ্চল থেকেই শত শত ঘন ফুট কাঠ পাচার হচ্ছে।  সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে কাঠ পাচারের ভীতিকর চিত্র।

বান্দরবানের লামা বন বিভাগের তৈন রেঞ্জ থেকে অবৈধভাবে পাচারকালে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ কাঠ জব্দ করা হয়েছে। গত ৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে বনকর্মীরা কাঠ পাচারের গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে এই কাঠ জব্দ করেন। কাঠ গুলো লামা বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চল (রিজার্ভ ফরেস্ট) থেকে পাচার করা হচ্ছিলো। এই সময় পাচারকারী চক্রের কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে আলীকদমের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড থেকে দুই দফায় রিজার্ভের কাঠ গুলো জব্দ করেন তৈন রেঞ্জের কর্মচারীরা। গত ৩ ডিসেম্বর ট্রাক ভর্তি অবৈধ কাঠ জব্দ করা গেলেও পাচারকারী চক্রের মূলহোতা রয়ে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এই কাঠপাচারকারী চক্রের মূল হোতা লামা উপজেলা রুপসী পাড়া ইউনিয়ন যুবলীগের সহ সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম। দীর্ঘদিন ধরে সে কাঠ ব্যবসার সাথে জড়িত থাকলেও বাস্তবে সে অবৈধ কাঠ পাচার চক্রের অন্যতম প্রধান হোতা। নিজের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে দীর্ঘদিন যাবৎ অবৈধভাবে কাঠ পাচার করে আসলেও ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না এলাকাবাসী। সপ্তাহ দুইয়ের ব্যবধানে দুই দফায় বন বিভাগের হাতে পাচারকালে কাঠ আটক হওয়ার ঘটনা সামনে আসায় বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বাস্তবে বনবিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে আব্দুল কাইয়ুম গংগণ প্রতিনিয়ত সংরক্ষতি বনাঞ্চল উজার করে চলেছে। হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রুপসী পাড়া ইউনিয়নের এক ব্যক্তি জানান, কাইয়ুম যে অবৈধ ভাবে গাছের ব্যবসা করে সে বিষয়টা এলাকার সবাই কম বেশী জানে। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়না।

প্রতিবেদকের হাতে আসা একটি ভিডিওতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের (রিজার্ভ ফরেস্ট) কাঠ পাচারের সাথে জড়িত বেশ কয়েক জন শ্রমিকের মুখে কাইয়ুমের কথা উঠে আসে। অবৈধভাবে কাঠ কাটতে আসা শ্রমিক ইউনুস, শাহ আলম, রাকিব ও সুমন  বলেন, তারা রুপসী পাড়া ইউপি’র ৫ নং ওয়ার্ডে আব্দুল ছাত্তার ফরাজীর ছেলে যুবলীগ নেতা আব্দুল কাইয়ুম এর নির্দেশে কাঠ কাটতে গিয়েছিলেন। গাছ কাটতে যাওয়ার আগে শ্রমিকদের কেউ-ই জানতেন না এইগুলা রিজার্ভের কাঠ।

এই বিষয়ে আব্দুল কাইয়ুম বলেন, আমি দীর্ঘদিন যাবৎ সুনামের সাথে কাঠ ব্যবসা করে আসছি। অবৈধভাবে কাঠ পাচারের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক থাকার প্রশ্ন-ই আসেনা। আমি যেহেতু রাজনীতি করি তাই একটি পক্ষ পরিকল্পিত ভাবে আমাকে হেয় করার জন্য অবৈধ কাঠ পাচারের প্রোপাগাণ্ডা ছড়াচ্ছে।

এই বিষয়ে তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা আবুল কাসেম জানান, আমরা গত ৩ ডিসেম্বর সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে পাচার কালে বেশ কিছু সেগুন কাঠ জব্দ করি।আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় এই সময় কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

এই বিষয় লামা বন বিভাগীয় কর্মকর্তা মোঃ আরিফুল হক বেলাল বলেন, পাচারের সময় রিজার্ভের কাঠ জব্দ করার বিষয় টা সত্যি। কাঠ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান আছে।

উল্লেখ্য, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি দেশের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। সরকারি হিসেবে দেশে মোট ভূমির ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ বনভূমি আছে বলা হলেও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, বাংলাদেশের মোট ভূমির মাত্র ১০ শতাংশ এখন বনভূমি হিসেবে টিকে আছে।

পরিবেশ-ভারসাম্য রক্ষার জন্য আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বনভূমির পরিমাণ ২০ শতাংশে উন্নতি করতে সরকারের অঙ্গীকার থাকলেও যেভাবে কাঠ পাচার ও বন উজার করা হচ্ছে তাতে সে লক্ষ্য পূরণ নয় বরং দেশ আরো বিপর্যয়ের দিকেই যাবে।

Check Also

বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় ভারত: প্রধানমন্ত্রী

প্রতিবেশীদের কেন্দ্র করে ভারতের পলিসি আছে জানিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির নবনিযুক্ত হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বলেছেন, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *